১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পিকিং অপেরা: চীনা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মঞ্চকলার দ্বিশতাব্দীর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি

নাজমুল হক রাইয়ান

চীনের জাতীয় অপেরা হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ‘পিকিং অপেরা’ প্রায় দুইশত বছরের প্রাচীন এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে ধারণ করে আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছে। এটি কেবল একটি সাধারণ নাট্যরূপ নয়, বরং সুর, নৃত্য, অভিনয়, মার্শাল আর্ট এবং রঙের মেলবন্ধনে গড়া এক অনন্য মহাকাব্য। চীনা সংস্কৃতির গভীরতা ও নান্দনিক সৌন্দর্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই অপেরার ভূমিকা অতুলনীয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিকাশ
পিকিং অপেরার ইতিহাস মূলত শুরু হয় ১৭৯০ সালের দিকে। কিং রাজবংশের সম্রাট ছিয়ানলং-এর ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আনহুই প্রদেশের চারটি খ্যাতনামা অপেরা দল তৎকালীন বেইজিংয়ে (তৎকালীন পিকিং) আগমন করে। তাদের অভিনয়ের অভিনবত্ব রাজদরবার ও সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। পরবর্তীতে, হুবেই প্রদেশের থিয়েটার দলগুলোর কৌশল এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অপেরার উপাদান এর সাথে যুক্ত হতে থাকে।

সম্রাট ছিয়ানলং এবং পরবর্তীতে সম্রাজ্ঞী দাওয়াকের ছিসি’র সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিল্পরূপ দ্রুত বিকশিত হয়। যা একসময় রাজদরবারের চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল, তা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয় এবং ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে ‘পিকিং অপেরা’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

সঙ্গীত, সুর ও আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য
পিকিং অপেরার প্রধান সুর মূলত আনহুই ও হুবেই প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী ‘সিপি’ (Xipi) ও ‘এরহুয়াং’ (Erhuang) থেকে উদ্ভূত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে যুক্ত হয়েছে নানাবিধ স্থানীয় অপেরার কৌশল। এটি আসলে গ্র্যান্ড অপেরা, ব্যালে ও অ্যাক্রোব্যাটিকসের এক সুরেলা মিশ্রণ। একটি সফল পরিবেশনায় নৃত্য, সংলাপ, একক অভিনয়, মার্শাল আর্ট ও মূকাভিনয়ের নিখুঁত সমন্বয় প্রয়োজন হয়।

প্রাচীনকালে এই অপেরা পরিবেশিত হতো খোলা মঞ্চ, চায়ের দোকান কিংবা মন্দিরের প্রাঙ্গণে। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য শিল্পীরা এক বিশেষ ধরনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠভঙ্গি ও উচ্চগ্রামের সুর ব্যবহার করতেন, যা আজও এই অপেরার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ
পিকিং অপেরার সঙ্গীত পরিচালনায় দুটি প্রধান বিভাগ থাকে: ‘ওয়েনচাং’ (ধ্রুপদী বা শান্ত দৃশ্য) এবং ‘উচাং’ (যুদ্ধ বা উত্তেজনাকর দৃশ্য)।

শান্ত দৃশ্য: এরহু, হুছিন, ইউছিন, শেং ও পিপার মতো ঐতিহ্যবাহী তার ও ফুঁ দিয়ে বাজানো বাদ্যযন্ত্রগুলো আবেগময় ও শান্ত দৃশ্যে সঙ্গত দেয়।

যুদ্ধ দৃশ্য: কাস্তানেট, ড্রাম ও করতালের মতো পারকাশন বাদ্যযন্ত্রগুলো যুদ্ধ এবং সংঘাতের দৃশ্যে টানটান উত্তেজনা ও আবহ তৈরি করে।

চরিত্রের বিন্যাস (চার শ্রেণি)
পিকিং অপেরার চরিত্রগুলোকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১. শেং (Sheng): মূল পুরুষ চরিত্র, যা আবার তরুণ, বৃদ্ধ বা যোদ্ধা ভেদে বিভিন্ন রকমের হতে পারে।
২. তান (Dan): নারী চরিত্র। অতীতে পুরুষরাই নারীদের পোশাকে এই চরিত্রে অভিনয় করতেন।
৩. চিং (Jing): রঙ মাখা মুখের শক্তিশালী পুরুষ চরিত্র, যারা সাধারণত যোদ্ধা, বীর বা খলনায়ক হয়ে থাকেন।
৪. ছৌ (Chou): কৌতুক অভিনেতা বা ভাঁড় চরিত্র, যারা মঞ্চে হাস্যরস ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটায়।

রূপসজ্জা, পোশাক এবং ‘মুখ পরিবর্তন’ কৌশল
পিকিং অপেরার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর প্রতীকী রূপসজ্জা বা মুখচিত্রণ (Lianpu)। মঞ্চে অভিনেতার মুখের রঙ দেখেই দর্শকরা চরিত্রের অন্তর্গত স্বভাব বুঝে নিতে পারেন। যেমন—লাল রঙ বীরত্ব ও আনুগত্যের প্রতীক, সাদা রঙ বিশ্বাসঘাতকতা বা ধূর্ততার এবং সবুজ রঙ একগুঁয়েমি ও সাহসিকতার বার্তা দেয়। মুখচিত্রণ এখানে ভাষার চেয়েও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।

এর পাশাপাশি রয়েছে ‘মুখ পরিবর্তন’ (Face-changing) কৌশল, যা দর্শকদের চোখের পলকে এক মায়াবী জগতে নিয়ে যায়। অত্যন্ত নিপুণ দক্ষতায় শিল্পীরা মুহূর্তের মধ্যে তাদের মুখের মুখোশ বদলে ফেলে রাগ, আনন্দ কিংবা ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। অভিনেতাদের জমকালো পোশাক, ভারী শিরস্ত্রাণ আর অলঙ্কৃত জুতো কেবল নান্দনিকতাই বাড়ায় না, বরং চরিত্রের সামাজিক মর্যাদা ও ঐতিহাসিক পরিচয় বহন করে।

পিকিং অপেরা কেবল চীনের বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি দেশটির ইতিহাস, দর্শন ও সমাজতত্ত্বের এক জীবন্ত দলিল। শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এর মূল আবেদন এবং ঐতিহাসিক চরিত্রদের মঞ্চরূপ আজও অপরিবর্তিত রয়েছে। আধুনিক সংস্কৃতির জোয়ারেও এই অপেরা তার নিজস্ব মহিমায় ভাস্বর, যা বিশ্ব নাট্যকলায় চীনের এক অনন্য ও গৌরবময় অবদান।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান

‘প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে নতুন দ্বার উন্মোচন হবে’

পিকিং অপেরা: চীনা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মঞ্চকলার দ্বিশতাব্দীর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি

বাজেটে বাড়তে পারে করমুক্ত আয়সীমা

চীনের ডার্ক ল্যাব: রাসায়নিক পরীক্ষায় নতুন যুগ

মেসি থাকতেই আরেকটি বিশ্বকাপ নিয়ে নিতে হবে: ইরফান

দ্বিগুণের বেশি বরাদ্দে স্বাস্থ্য খাতে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা

ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বড় সুখবর দিল আমিরাত

নিত্যপণ্যে স্বস্তির খবর, ৬০ পণ্যের দাম কমাতে কর হ্রাস