চীন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর। গত বছর আমরা বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছি। একই সঙ্গে ওই বছরটি ছিল আরো তাত্পর্যপূর্ণ। কারণ এটি চীনের প্রতিষ্ঠার ৭৬তম বার্ষিকীও।
উচ্চ পর্যায়ের সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীন একটি কৌশলগত অংশীদারি গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ও আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেছে। এর লক্ষ্য পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার পথে এগিয়ে যাওয়া। এই সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে টিকে রয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হলো অভিন্ন লক্ষ্য, আদর্শ ও আকাঙ্ক্ষা অর্জনের জন্য পারস্পরিক উপকারে আসে এমন চুক্তি বাস্তবায়ন করা। এতে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্পদ ও সক্ষমতা ভাগাভাগি করাও অন্তর্ভুক্ত। আজকের বিশ্বে যেখানে অনেক সম্পর্ক শুধু লেনদেনভিত্তিক, সেখানে কৌশলগত অংশীদারি তার চেয়েও গভীরে যায়। এর জন্য প্রয়োজন গভীর আস্থা, বোঝাপড়া ও অভিন্ন অঙ্গীকার।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষকে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব স্বাগত জানিয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এ উপলক্ষে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং, চীনা নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি উষ্ণ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আখ্যায়িত করেছেন এভাবে— ‘বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় আবদ্ধ দেশগুলো কিভাবে একসঙ্গে সর্বোচ্চ অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ।’
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন, কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দেশের সহযোগিতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় অংশীদারি
অধ্যাপক ইউনূস স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশ ছিল ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)’-এ যোগ দেওয়া এই অঞ্চলের প্রথম দেশ।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সম্পর্ক আরো এগিয়ে যাবে এবং ‘শান্তি, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যত্’ গড়ে তুলবে।
বাংলাদেশ-চীন স্বার্থ ও লক্ষ্যসমূহের সামঞ্জস্য
বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি বরাবরই বাংলাদেশের অগ্রাধিকার। অন্তর্বর্তী সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বাণিজ্য বাজার বহুমুখীকরণ, বিদ্যমান অর্থনৈতিক অংশীদারি গভীর করা এবং কৌশলগত আন্তর্জাতিক অংশীদারি গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। তবে এসব অংশীদারি অবশ্যই আমাদের স্বার্থ, লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
বাণিজ্য, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি
বিআরআইয়ের আওতায় বর্তমানে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ৩৫টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদার। চীনা
বিনিয়োগে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র (বিআইসিসি), চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দেশের প্রথম টানেল, ঢাকার প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দাশেরকান্দির দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় পয়ঃশোধনাগার, আটটি বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, প্রথম আইভি টিয়ার ডেটা সেন্টার এবং পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণেও একটি চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুত্ খাতেও বড় বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট ও বাঁশখালী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র।
বাংলাদেশে চীনের জন্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিকস, আইসিটি সেবা, টেলিযোগাযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ইভিসহ অটোমোবাইলশিল্প। পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল খাতও অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
চীনের অবদানের স্বীকৃতি
ড. ইউনূস বৈশ্বিক দক্ষিণের পক্ষে শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে চীনের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং ২০২৫ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের অঙ্গীকারকে গুরুত্ব দেন। তিনি এটিকে তাঁর নিজস্ব ‘থ্রি জিরো’ ধারণার সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ‘বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে একটি আরো ন্যায্য, সবুজ ও টেকসই বিশ্ব গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।’
সুবর্ণ জয়ন্তীতে চীনা দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘নতুন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি ঘিরে যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করা, কৌশলগত পারস্পরিক আস্থা গভীর করা এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।’ তিনি আরো বলেন, ‘একসঙ্গে বাংলাদেশ ও চীন আরো ন্যায়সংগত ও সমতাভিত্তিক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।’
সরবরাহ শৃঙ্খলে এশিয়ার প্রাধান্য ও সম্ভাব্য কৌশল
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি মূলত পশ্চিমা বাজার নির্ভর। তবে কাঁচামাল ও সরবরাহ শৃঙ্খলে এশিয়া, বিশেষ করে চীন প্রধান ভূমিকা পালন করছে। এই অসমতা বাংলাদেশকে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়।
ভ্যাকসিন সহযোগিতা : বিপদে বন্ধু
২০২১ সালে আমি যখন চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলাম, তখন কভিড-১৯ সংকটে চীন সিনোফার্মের টিকা ও প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসামগ্রী দিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। প্রায় ৭৭.৫ মিলিয়ন টিকা ও সিরিঞ্জ বাংলাদেশে পরিবহন করা সম্ভব হয়েছিল, যা জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু করতে সহায়তা করে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এখনো বিপুল অপ্রকাশিত সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানি ব্যবস্থাপনা, সবুজ অর্থনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতা। চীন স্বীকার করেছে যে বাংলাদেশ ও চীন উভয়ে সমন্বিত কৌশলগত অংশীদার। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরো গভীর ও বিস্তৃত হবে—এটাই প্রত্যাশা।