কয়েক বছর ধরেই চাপে রয়েছে অর্থনীতি। এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতি রয়েছে। এর অন্যতম কারণ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এ ধরনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার আগামী অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে। নতুন বাজেট ঘোষণার আগে অর্থনীতিতে আটটি বড় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
বাজেট সামনে রেখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৈরি এক প্রতিবেদনে এসব চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় মনে করছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রস্তুতি এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো প্রধান চ্যালেঞ্জ।
মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অর্থনীতি কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ স্থবিরতা ছিল উল্লেখযোগ্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিক্ষোভের ফলে কলকারখানার উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাল্টাপাটি শুল্ক আরোপ বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কাও বাড়িয়ে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকরী বাজেট প্রণয়নে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে নতুন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের চলমান আটটি কর্মসূচিতে ভাতার পরিমাণ এবং কিছু ক্ষেত্রে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি
বিভিন্ন ক্ষেত্রে অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীদের এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কমে গেছে। ব্যবসা সম্প্রসারণও থমকে গেছে। বিনিয়োগের ওপর এমন নেতিবাচক প্রভাবের কারণে নতুন কর্মসংস্থানের গতি ধীর।
বিনিয়োগ পরিস্থিতি বুঝতে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি অন্যতম নির্দেশক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকার বেড়েছে সোয়া ৩ লাখ। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ ৩০ হাজার। গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৪ লাখ।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা আদায়ের দাবিতে আন্দোলন-হামলার ঘটনায় কিছু পোশাক কারখানা এবং অন্যান্য ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। উৎপাদনশীল খাতের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের একটি অংশ বেকার হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাজেটের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। নতুন বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রাস্তাঘাট নির্মাণ, সংস্কারসহ গ্রামীণ অবকাঠামো খাতের কর্মযজ্ঞ বাড়ানো হবে।
রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত নয়, চাপ সুদ পরিশোধে
আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৫ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা এনবিআরকে আদায় করতে হবে। এনবিআরবহির্ভূত কর এবং কর ব্যতীত রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে যা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে করা হয় ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছে এনবিআর, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা কম। আগামী বাজেটে রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম অটোমেশনসহ শুল্কছাড় ও কর অব্যাহতি কমিয়ে আনাসহ নতুন বেশ কিছু খাতে ভ্যাট ও কর বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দেশি-বিদেশি উৎসে এখন সরকারের মোট ঋণ প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ কোটি টাকা। নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে দেশি ও বিদেশি মিলে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই সরকারের ব্যয় প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত ব্যয় আরও বেশি হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।
কেমন হচ্ছে বাজেট আকার
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যয়ের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেটের আকার কমলেও পরিচালন বা অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। তবে উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ কমিয়ে রাখা হচ্ছে ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার। আগামী বাজেটে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ অনুমোদন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, আগামী বাজেটে প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। করের হার না বাড়িয়ে ভিত্তি বাড়াতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা থাকতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়াসহ বর্তমানের সার্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটও উচ্চাভিলাষী। বাস্তবায়নযোগ্য করার জন্য আরও ছোট করা উচিত।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, আগের মতো বড় ও রাজনৈতিক প্রকল্প নেওয়া উচিত হবে না। বাজেট করলে ঠিকমতো খরচ করতে হবে।