ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো পুনরায় যাচাই বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিরীহ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হন, সেজন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল, সেগুলো পর্যালোচনা করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা আবার তদন্ত করা হবে। গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। বৈঠকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে একে একে সেগুলো তুলে ধরেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫ই আগস্টের পর বেশ কিছু মামলা হয়েছে, কিছু সুবিধাবাদী মানুষ এসব মামলা করেছে। ব্যবসায়ী-সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষদের নামে মামলা করা হয়েছে। এসব মামলা যাচাই বাছাই করা হবে এ জন্য যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিরীহ মানুষ যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন, সে জন্য এসব মামলা পুনরায় যাচাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পুলিশ সরকারকে প্রতিবেদন দেবে।
সভার সিদ্ধান্ত তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে (২০০৯ থেকে ’২৪ সাল) দেয়া অস্ত্রের লাইসেন্সগুলো যাচাই বাছাই করা হবে। তিনি বলেন, বিগত সময়ে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে কিনা, কাদের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, তারা লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য ছিল কিনা, তা দেখা হবে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যাচাই বাছাইয়ের সময়ে যারা লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তাদের অস্ত্রের লাইসেন্স বহাল থাকবে আর যাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং অপরাধের উদ্দেশ্যে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, সেসব লাইসেন্স বাতিল করা হবে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিধি’র বাইরে প্রটোকল দেবেন না এসপি: বৈঠকের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপাররা (এসপি) অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে প্রটোকল দিয়ে থাকেন। এখন থেকে বিধি’র বাইরে গিয়ে এসপিরা কাউকে প্রটোকল দেবেন না। লটারির মাধ্যমে ওসি ও এসপি পদায়ন বন্ধ করা হবে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পুলিশের চেইন অব কমান্ড থাকতে হবে। এখন থেকে পুলিশের ওসি ও এসপি পদায়নে লটারি পদ্ধতি থাকবে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, লটারির মাধ্যমে নিয়োগের কারণে যাকে যেখানে দেয়া দরকার, তাকে সেখানে দেয়া যায় না। তা ছাড়া বিগত সময় লটারিতে পদায়ন স্বচ্ছ ছিল না। যিনি যেখানে যোগ্য, তাকে সেখানে পদায়ন করা হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে স্থায়ী ঠিকানা জালিয়াতি করে পুলিশের কনস্টেবল পদে যারা চাকরি নিয়েছেন, সেসব নিয়োগ যাচাই বাছাই করা হবে বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, নাম-ঠিকানা জালিয়াতি করে পুলিশে অনেকে চাকরি নিয়েছেন বলে শোনা যায়। এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কিনা, তা দেখতে পুলিশকে বলা হয়েছে। তবে অহেতুক পুলিশের সবাই যেন ঘাবড়ে না যান সে বিষয়ে আশ্বস্ত করে মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে কেউ যাতে এই কাজ না করেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, পুলিশের সব পর্যায়ে ২ হাজার ৭০১ জন কনস্টেবলের পদ খালি রয়েছে। দ্রুত এসব পদে নিয়োগ দেয়া হবে। এ ছাড়া ২০০৬ সালে চাকরি হারানো ৬৩০ পুলিশ সদস্য চাকরি ফিরে পাবেন বলে জানান তিনি।
পাসপোর্ট অফিসের ভোগান্তি নিরসনের জন্য সরকার একটা পন্থা বের করেছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে এটা চালু করা হবে। সেটি হলো দলিল লেখকদের মতো পাসপোর্টেও কিছু লোকজন থাকবে নিবন্ধিত, যারা পাসপোর্টের কাজটি করে দেবেন। এ জন্য তারা সার্ভিস চার্জ নিতে পারবেন। এতে একদিকে মানুষের কর্মসংস্থান হবে, আবার ভোগান্তি কমে আসবে। মব ভায়োলেন্সের বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যদি কোথাও ‘মব ভায়োলেন্স’ হয়ে থাকে, তাহলে সরকার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেবে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সাক্ষাৎকারের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকের কথা বলার অধিকার রয়েছে। যে যার মতো করে কথা বলবেন। প্রত্যেকের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী, এসবি’র অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. গোলাম রসুল, র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব দেলোয়ার হোসেন, সিআইডি’র অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ছিবগাত উল্লাহ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার, এনটিএমসি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ওসমান সরোয়ার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল, কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান উপস্থিত ছিলেন।
বিডিআর বিদ্রোহের নতুন তদন্ত হবে: বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আমরা এটার জন্য আরেকটা তদন্ত কমিশন গঠন করার কথা বলেছি, আমাদের প্রতিশ্রুতি আছে। আমাদের ইশতেহারের মধ্যেও আছে। পুনঃতদন্ত বা কমিশন গঠন করে ন্যায়বিচারের জন্য। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি আশ্বাস দেন, পুলিশের যারা পদবঞ্চিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, তারা অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে।